Home জীবনশৈলী অরণ্যের আঁধারে আলোর খোঁজ: জিলিং সেরেং-এর গল্প

অরণ্যের আঁধারে আলোর খোঁজ: জিলিং সেরেং-এর গল্প

অরণ্যের আঁধারে আলোর খোঁজ: জিলিং সেরেং-এর গল্প
অরণ্যের আঁধারে আলোর খোঁজে জিলিংসেরেং।। ছবি : বাসু কর

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার বাগমুন্ডির অযোধ্যা পাহাড়ের এক প্রত্যন্ত কোণে লুকিয়ে আছে একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম — জিলিং সেরেং। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থান করা এই গ্রামটির নিকটতম বাজার প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। আধুনিক নাগরিক জীবনের ছোঁয়া এখানে খুবই ক্ষীণ। চারদিক জুড়ে পাথুরে পাহাড়, অরণ্য আর নির্জনতা। এখানে বাস করেন প্রায় ৯৫টি আদিবাসী পরিবার। বর্তমানে কৃত্রিম “AI” কথাকথিত আধুনিক সময়ও যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে পারেনি বহু দশক ধরে, সেখানেই জ্বলে উঠেছে একটি ছোট্ট দীপশিখা — মালতী মুর্মুর অদম্য লড়াই-এর। 

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে” 

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লেখা অন্নদামঙ্গলের এই লাইনটি বর্তমান সময়ে বড্ড প্রাসঙ্গিক। জয় গোস্বামীর কবিতার পরিপ্রেক্ষিতেমালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় আজ কতটা প্রাসঙ্গিক তার প্রমাণ মেলে, পুরুলিয়ায় আধারনামা সেই গ্রামে মালতী মুর্মু’র ইচ্ছা শক্তির কাছে। তিনি একা নন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তার স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা। 

তিনি এই গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূ। দুই সন্তানের মা। তার স্বামী একজন কৃষক। ২০২০ সালে লকডাউনের সময় যখন স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন তিনি ভাবলেন — এভাবে চলতে থাকলে গ্রামের এই শিশুরা আর কোনোদিনও স্কুলের মুখ দেখবে না।

মাত্র ২ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন — এই গ্রামে শিক্ষার দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন। নিজের কুঁড়েঘরটিকেই তিনি বানিয়ে ফেলেন স্কুল। শুরু করেন কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে। পরে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৬০ জনে।

প্রথমদিকে স্বামীর আপত্তি থাকলেও, মালতীর ইচ্ছাশক্তির কাছে তিনি হার মানেন এবং পরে স্ত্রীকে সমর্থন করতে থাকেন। আজ গ্রামের প্রায় ৮৫টি পরিবারের শিশুরা মালতী মুর্মুর কাছে পড়ছে। বিনামূল্যে পড়াশোনা, বই, খাতা — যতটুকু সম্ভব নিজেই জোগাড় করে দেন। [maxbutton id=”1″]

আজকের দিনে যখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও মহাকাশ নিয়ে কথা বলছি, তখন ভারতেরই কোনো এক কোণে এমন একটি গ্রাম আছে, যেখানে শিশুরা আজও কাগজ-কলমের স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নপথে তাদের হাত ধরে হাঁটছেন এক নারী — মালতী মুর্মু।

তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন — একাকী হলেও বদল আনা সম্ভব। তাঁর এই লড়াই একদিন আরও অনেকের মনের প্রদীপ জ্বালাবে, এটাই আমাদের বিশ্বাস।

জিলিং সেরেং পৌঁছানোর পথ

যারা এই গ্রামটি দেখতে বা সাহায্য করতে আসতে চান, তাদের জন্য এখানে পথনির্দেশ দেওয়া হলো —

📍 পুরুলিয়া শহর → বাগমুন্ডি → অযোধ্যা পাহাড় রোড → মার্বেল লেকের পাশের রাস্তা → টাঁড়পানিয়া → ভুঁইঘোরা প্রাথমিক বিদ্যালয় → বাঁদিকে ঘুরে → সোজা তেলিয়াভাসা মোড় → সেখান থেকে আরও প্রায় ৬ কিমি এগোলেই জিলিং সেরেং।

[molongui_post_meta]

তথ্যসূত্র

. ভারতের শিক্ষা ও সমাজ — ড. অশোক মিত্র
২.  শিক্ষা ও স্বাধীনতা — জ্ঞানদাস বসু
৩. পল্লীভারত — ড. নিত্যানন্দ মুখোপাধ্যায়
৪. গ্রামীণ সমাজ ও শিক্ষা — অজিতকুমার দে
৫. শিক্ষার সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি — অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়
৬. অ-আ-ক-খ: বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা আন্দোলনের ইতিবৃত্ত — গৌতম চক্রবর্তী
৭. মুক্তি ও শিক্ষা — বিনয় ঘোষ
৮. বঙ্গের গ্রামসমাজ ও পল্লীজীবন — সতীশচন্দ্র বসু
৯. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও বাংলার কৃষক আন্দোলন — অমলেন্দু দে
১০. সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত — হরিপদ সান্যাল
১১. আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি — বিনয়কৃষ্ণ দাস
১২. অরণ্যের অধিকারী — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


Previous article ব্যোমকেশের বাঙালিয়ানা
Next article সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ
সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here