Home বাঙ্গালীয়ানা আধ্যাত্মিক পিতৃ পক্ষ ২০২৫ অমাবশ্যা: মহালয়ার তর্পণ স্নান কেন করা জরুরী

পিতৃ পক্ষ ২০২৫ অমাবশ্যা: মহালয়ার তর্পণ স্নান কেন করা জরুরী

পিতৃ পক্ষ ২০২৫ অমাবশ্যা: মহালয়ার তর্পণ স্নান কেন করা জরুরী
পিতৃপক্ষ'র তর্পণ স্নান। ছবি : বাসু কর।

পিতৃপক্ষ: পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা ও আশীর্বাদ লাভের বিশেষ সময়


পিতৃ তর্পণ: পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন

পিতৃ তর্পণ হলো এক বিশেষ ধর্মীয় আচার যেখানে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল, জল ও অন্ন নিবেদন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁদের আশীর্বাদ লাভ করা এবং তাঁদের আত্মাকে তৃপ্ত করা। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পরের দিন থেকে পিতৃপক্ষের সূচনা হয় এবং শেষ হয় অমাবস্যা তিথিতে, যেদিন মহালয়া পালিত হয়।

হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী, যখন সূর্য উত্তরায়ণ থেকে দক্ষিণায়ণ গমন করে (অর্থাৎ সূর্যের গতি দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবেশ করে), তখন এই সময়কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়। এটি এমন এক সময় যা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে পবিত্র বলে গণ্য। বিশ্বাস করা হয়, এই সময় পূর্বপুরুষরা পিতৃলোক থেকে মর্ত্যে এসে তাঁদের উত্তর পুরুষদের বাড়িতে অবস্থান করেন এবং জল, তিল ও অন্ন গ্রহণ করেন। তাই ঘরে ঘরে ও নদী-ঘাটে এই সময় তর্পণের আয়োজন হয়। [maxbutton id=”1″]

রাধা-কৃষ্ণের দোল – প্রেম, ভক্তি ও অনন্ত ঐশ্বর্যের চিরন্তন প্রতীক।। ফটো: বাসু কর


পিতৃ তর্পণের বিশেষ রীতি রয়েছে। সাধারণত বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ভোরবেলা নদী, পুকুর বা জলাশয়ে গিয়ে হাঁটু পর্যন্ত জলে নেমে তর্পণ করেন। তাঁরা হাতে কুশ ও তিল নিয়ে জল নিবেদন করেন এবং পূর্বপুরুষদের নাম উচ্চারণ করেন। শাস্ত্র মতে, প্রত্যেক জীবিত মানুষের তিন পুরুষ পর্যন্ত আত্মা পিতৃলোকে অবস্থান করে। কারো মৃত্যু হলে, তার পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন আত্মা পিতৃলোক ত্যাগ করে স্বর্গলোকে গমন করার অধিকার পান।

মহালয়া: পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও দেবীপক্ষের সূচনা

পিতৃপক্ষের শেষ দিনটি মহালয়া নামে পরিচিত। এই দিনটি শুধু পিতৃ তর্পণের জন্য নয়, দুর্গাপুজোর সূচনার প্রতীক হিসেবেও বাঙালির কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মহালয়ার ভোরবেলায় রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার ঐতিহ্য বহু পুরনো। এদিন ঘাটে ঘাটে ভিড় জমে তর্পণের জন্য। ভোরের প্রথম প্রহরে নদীর ঘাটে পুরুষদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তর্পণ করতে দেখা যায়।

মহালয়া তিথির তর্পণকে সবচেয়ে শুভ এবং ফলপ্রদ বলে মনে করা হয়। যাঁরা পিতৃপক্ষের অন্যদিন তর্পণ করতে পারেন না, তাঁরা বিশেষত মহালয়া দিনে তর্পণ করে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

মহাভারতের গল্পে পিতৃপক্ষের উত্পত্তি

পিতৃপক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাভারতের এক উল্লেখযোগ্য কাহিনি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কর্ণের মৃত্যু হলে তাঁর আত্মাকে স্বর্গে সোনা ও রত্ন খেতে দেওয়া হতো। কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন কেন তাঁকে অন্ন দেওয়া হচ্ছে না। ইন্দ্র জানালেন, জীবদ্দশায় কর্ণ সম্পদ দান করেছেন বটে, কিন্তু কখনো পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দান করেননি।

কর্ণ তখন নিজের বংশপরিচয় জানতে পারেন এবং আর্জি জানান পূর্বপুরুষদের জন্য তর্পণ করার। দেবরাজ ইন্দ্র কর্ণকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন যাতে তিনি পিতৃপক্ষ পালন করতে পারেন। সেই থেকেই এই ১৫ দিনের সময়কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

জ্যোতিষশাস্ত্রে পিতৃপক্ষ

জ্যোতিষশাস্ত্র মতে সূর্য যখন কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে তখন পিতৃপক্ষের সূচনা হয়। আবার সূর্য যখন তুলা রাশিতে প্রবেশ করে, তখন পূর্বপুরুষদের আত্মারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। তাই এই সময়কালকে বিশেষ শুভ মনে করে তর্পণের আয়োজন করা হয়।

নারীদের তর্পণ নিয়ে বিতর্ক

যুগ বদলেছে, সমাজের মানসিকতা বদলেছে। আগে মনে করা হতো পিতৃ তর্পণ শুধু পুরুষদের কর্তব্য। কিন্তু হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও উল্লেখ নেই যে নারীরা তর্পণ করতে পারবেন না। আজকাল অনেক নারীও পিতৃপক্ষের তর্পণে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, মা-বাবার সন্তান ছেলে-মেয়ে উভয়েই, তাই কেন শুধুই পুরুষদের জন্য এই আচার সীমাবদ্ধ থাকবে?

আধুনিক সময়ে পিতৃপক্ষের গুরুত্ব

আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই আচার-অনুষ্ঠান পালনে সময় দিতে পারেন না। তবু পিতৃপক্ষের তাৎপর্য বাঙালির মনে আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে পিণ্ডদান না করলেও অন্তত মহালয়া দিনে অনেকে গঙ্গা বা নিকটস্থ নদীতে গিয়ে তর্পণ করেন। আবার অনেক মন্দির বা পুরোহিত সংগঠিতভাবে পিণ্ডদান ও তর্পণের আয়োজন করেন, যাতে ব্যস্ত মানুষও অংশগ্রহণ করতে পারে।

পিতৃপক্ষ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি মূলত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময়। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা, তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা এবং প্রজন্মের মধ্যে যোগসূত্রকে দৃঢ় করা – এই সবই পিতৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। [molongui_post_meta]

তথ্যসূত্র :

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here