দুর্গাপুজো আজ বিশ্বমানবতার এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৯ সালে ইউনেস্কো যখন একে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” ঘোষণা করে, তখন এ উৎসব কেবল ধর্মীয় নয়, বরং শিল্প-সংস্কৃতির মহোৎসব হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু প্রশ্ন আসে দুর্গাপুজোর সূচনা কি শুধুই ধর্মীয় আচার ছিল, নাকি ইংরেজ শাসকদের খুশি করার উদ্দেশ্যে তার বিকাশ ঘটেছিল? এই প্রবন্ধে আমরা সেই ইতিহাসের নানা দিক পর্যালোচনা করব।
দুর্গাপুজোর উৎস বহু প্রাচীন। ষোড়শ শতাব্দীর মঙ্গলকাব্যে দেবী দুর্গার পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে লিখেছিলেন, “জগৎমোহিনী মহামায়া দুর্গতিনাশিনী”
এই লাইন থেকেই স্পষ্ট যে, দুর্গাপুজো ছিল শাক্ত সাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তবে সে যুগে এটি ছিল মূলত রাজা-জমিদার শ্রেণির ব্যক্তিগত পুজো, সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত ছিল।

নদীয়ার রাজা কংসনারায়ণের পুজো
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে নদীয়ার ভক্তকুলের রাজা কংসনারায়ণ মহাযজ্ঞ আকারে দুর্গাপুজো আয়োজন করেন। এটিকে বাংলার প্রাচীনতম পুজোগুলির অন্যতম ধরা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য বনেদি জমিদার পরিবারেও দুর্গাপুজো ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বঙ্গদর্শন গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন, “দুর্গোৎসব ছিল রাজোৎসব; প্রজারা ছিলেন দর্শক মাত্র।” এ থেকেই বোঝা যায়, সে সময় পুজো ছিল মূলত ক্ষমতার প্রকাশ ও সামাজিক প্রতিপত্তির নিদর্শন।

ইংরেজদের খুশি করার প্রয়াস
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়। ইংরেজদের কাছে ঘনিষ্ঠতা অর্জনের জন্য অনেক জমিদার দুর্গাপুজোকে হাতিয়ার করেন। কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণ দেব এর প্রধান উদাহরণ। তিনি সেই বছরেই শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন।
ইংরেজ সাহেবদের বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হত। ভোজ, সুরা ও সাংস্কৃতিক আসরের মাধ্যমে সাহেবদের আপ্যায়ন করা হত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কবি উপন্যাসে লিখেছিলেন, “পূজার চেয়ে ভোজন আর সাহেবদের আমোদই ছিল তখন বড়ো।” রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের জন্যই নবকৃষ্ণ দেবের এই আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখান থেকেই কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিতে দুর্গাপুজোর জাঁকজমক বাড়তে থাকে।
বনেদি পুজোর ঐতিহ্য
শোভাবাজার রাজবাড়ি ছাড়াও লাহা বাড়ি, ঠাকুরবাড়ি, মল্লিক বাড়ি প্রভৃতি বনেদি পরিবার দুর্গাপুজোকে এক বিশেষ ঐতিহ্যে পরিণত করে। প্রতিটি বাড়ির পুজো আলাদা বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন, “আমাদের বাড়ির পূজা কেবল দেবী আরাধনা নয়, ছিল শিল্প আর সঙ্গীতের মহোৎসব।“

বারোয়ারি পুজো ও গণঅংশগ্রহণ
আঠারো শতকের শেষ ভাগে দুর্গাপুজো গণরূপ নিতে শুরু করে। শোনা যায়, কলকাতায় বারো জন বন্ধু মিলে পুজো আয়োজন করেছিলেন, সেখান থেকেই “বারোয়ারি পুজো” শব্দের উৎপত্তি। উনিশ শতকের শেষে এটি “সার্বজনীন পুজো” নামে জনপ্রিয় হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে এক জায়গায় সাধারণ মানুষের দুর্গাপুজো ঘিরে আনন্দের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে পুজো হয়ে উঠেছিল গ্রামের মিলনমেলা। এই ধারা ক্রমে শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ শতক ও সার্বজনীনতার বিকাশ
বিশ শতকের শুরুতে পাড়ায় পাড়ায় সার্বজনীন পুজো প্রসার ঘটে। সাধারণ মানুষ চাঁদা তুলে প্রতিমা গড়ায়, প্যান্ডেল সাজায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন,
“দুর্গাপূজা আজ কেবল দেবীর পূজা নয়, এ হলো বাঙালির মিলনোৎসব।“
আজকের দুর্গাপূজা!
কলকাতার প্যান্ডেল, থিম, আলোকসজ্জা, প্রতিমা… সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা এখন শিল্প-সংস্কৃতির মহোৎসব। ২০১৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রমাণ করে, দুর্গাপূজা আজ আর কেবল বাংলার নয়, বিশ্বমানবতার গৌরব। দুর্গাপুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল রাজা-জমিদারের ব্যক্তিগত সাধনা থেকে। ইংরেজ আমলে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বারোয়ারি ও সার্বজনীন পূজার মাধ্যমে এটি জনগণের উৎসব হয়ে ওঠে। আজকের দুর্গাপুজো বাঙালির প্রাণের উৎসব ধর্মীয় ভক্তি, সামাজিক মিলন ও শিল্প-সংস্কৃতির মহামিলন।
তথ্যসূত্র
চণ্ডীমঙ্গল — কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
বঙ্গদর্শন — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
কপালকুণ্ডলা — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দুর্গোৎসব (প্রবন্ধ) — দীনবন্ধু মিত্র
বঙ্গের সমাজ ও সংস্কৃতি — অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
কবি — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
গণদেবতা — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
পথের পাঁচালী — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
অরণ্যের দিনরাত্রি — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবনস্মৃতি — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর