Home শিল্পকলা সাহিত্যচর্চা বইয়ের গল্প বইপাড়ায়

বইয়ের গল্প বইপাড়ায়

বইয়ের গল্প বইপাড়ায়
বইয়ের-গল্প-বইপাড়ায়, বাসুদেব কর

দুই মলাট বইয়ের মাঝে, কত গল্প গোপন থাকে। (মৃত্যুমিছিল)

দেশি হোক কিংবা বিদেশি, কলকাতায় এলে সকলেই একবার এই কলেজ স্ট্রিট দর্শন করে যান। আপনারা ভাবতেই পারেন, বই ছাড়া এখানে আবার দেখার আছে টা কি! আমি বলব, ‘আছে আছে, ইতিহাস থেকে বিজ্ঞান, ভূগোল থেকে সাহিত্য, গল্প থেকে উপন্যাস, কবিতা থেকে নাটক…‘ এইসবের রসদ যে মিলবে এখানেই। 

বই পাড়ায় সস্তায় স্বপ্ন বিক্রি হয় বছরের তিনটে দিনে, বই প্রেমীদের ভিড় বলে দেয় মানুষ আজও ঠিক কতটা বইমুখী। প্রজাতন্ত্র দিবস (২৬শে জানুয়ারি), পয়লা মে( ১লা মে), স্বাধীনতা দিবস( ১৫ই আগস্ট); এই তিন দিনে কম দামে হাতে চলে আসে কিছু অমূল্য রত্ন, তারই খোঁজে কলেজ স্ট্রিটে হানা দেয় বইপোকারা। 

ছোটবেলায় আমাদের মা ঠাকুমারা বলতেন, বই মাটিতে রাখতে নেই, তাহলে বিদ্যা চলে যায়…। কিন্তু কলেজস্ট্রিটে হাজার হাজার বইয়ের ঠিকানা মেলে সেই রাস্তায়, যে রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যস্ততা আনাগোনা করে চলেছে। বছরের ওই তিনটে দিনে সস্তার বইমেলার সন্ধান পায় অনেকে, সন্ধান নয় বরং অপেক্ষা করে অধীর আগ্রহে। আপনার ভাগ্য যদি ভালো থাকে তাহলে, দামে কম মানে ভালো বই আপনিও পেয়ে যেতে পারেন। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, লিও তলস্তোয় (রাশিয়ার উপন্যাসিক), জে. কে রয়েলিং (হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা), হারু কি মুরাকামি (জাপানি লেখক), সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সত্যজিৎ রায় ( ফেলুদা সিরিজ, প্রফেসর শঙ্কু), শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (ব্যোমকেশ সমগ্র), অগাস্টা ক্রিস্টি– সমস্ত লেখকের বইয়ের সন্ধান মিলে এই এক জায়গায়। কলেজ স্ট্রিট নামটা শুনলে কানে ভেসে আসে কাগজের পাতার শব্দ, চোখে পড়ে পুরনো ধূসর তাক, যা দেশি-বিদেশি ভিন্ন রকমের বইয়ে ভর্তি। আর মন চলে যায় সেই আড্ডা টেবিলে কফি হাউসে, যেখানে এক কাপ চায়ের সঙ্গে আলোচনা হয় জীবন বনাম সাহিত্য, শিল্প ও শিল্পীর আদলে রাজনীতি ও প্রেম এবং থিয়েটারের নানা বিষয়।

কলেজ স্ট্রিটের বই বাজার শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়, যখন কলকাতার মাঝে গড়ে উঠেছিল হিন্দু কলেজ (১৮১৭), প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭) ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি। ঠিক সেই সময়েই বেড়ে ওঠে এই শিক্ষার পীঠস্থানে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্য বই, পত্রিকা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বইয়ের বিপুল চাহিদা। 

প্রথমদিকে বইয়ের দোকান ছিল কেবলমাত্র ইংরেজি ও পাঠ্য বই কেন্দ্রিক। ধীরে ধীরে এখানে গড়ে ওঠে বহু সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের দোকান, যারা অর্ধেক বা তার চেয়েও কম দামে দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রি করতে শুরু করে। এভাবেই কলেজ স্ট্রিট হয়ে ওঠে এমন একটি বাজার, যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় দুর্লভ পান্ডুলিপি থেকে সমকালীন গবেষণা পর্যন্ত সবকিছু। আজও এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে বই কিনতে, অথবা আসে বিক্রি করতে, আসে বই পরিবর্তন করতে, আসে অথবা শুধু ঘুরে দেখতে। এটি হয়ে উঠেছে এমন এক জায়গা যেখানে বইয়ের পাতায় লেখা থাকে সময়ের স্পর্শ।

কলেজ স্ট্রিটের মাটিতে গড়ে ওঠা প্রকাশনার ইতিহাস: 

১. কৃত্তিবাস (১৯৫৩): 

সত্তরের দশকের কবিদের জন্মস্থান বলা হয় এই পত্রিকাকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, তুষার রায় প্রমুখ ছিলেন এই পত্রিকার প্রাণ।

২. দেশ ( ১৯৩১):

বাণিজ্যিক পত্রিকা, কিন্তু এটির বহু বিক্রয় কেন্দ্র ও পাঠক বেশ ছিল কলেজস্ট্রিট অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে অতীন্দ্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল সবাই এখানে নিয়মিত লিখতেন। সাহিত্যচর্চার এক নতুন অধ্যায় রচিত হয় এই পত্রিকার হাত ধরে। 

৩. পরিচয় ( ১৯৩১): 

সাজানো গদ্য ও রাজনৈতিক ভাবনা ও নান্দনিক চিন্তার মেলবন্ধন ছিল পরিচয় পত্রিকার মূল শক্তি। এই পত্রিকা কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে গড়ে ওঠা বামপন্থী আড্ডা ও সাহিত্যচক্রের প্রভাব বহন করে আনে। 

শুরু ও শেষের ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে গেলে, আরো এমন অনেক পত্রিকা আছে যেগুলোর সব নাম লিখে শেষ হবে না। শুধু বাঙালি সাহিত্যে নয়, আন্তর্জাতিক সাহিত্যেও এর ছাপ রেখে এসেছে। যদিও সরাসরি কলেজ স্ট্রিট নিয়ে বহু বিদেশী সাহিত্যিক বা সাংবাদিক প্রচুর লেখেননি, কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও ভ্রমণ সাহিত্যে এটি উল্লেখযোগ্য হয়েছে। যেমন: 

১. Dominique Lapierre: City of joy

এই বিখ্যাত ফরাসি লেখক কলকাতাকে ঘিরে এই বইটি লিখেছেন। যদিও বই এর মূল প্রেক্ষাপট কলকাতার বস্তি ও হিউম্যান ড্রামা তবুও তিনি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানের বিবরণ দিয়েছে যার মধ্যে কলেজ স্ট্রিট ও এর আশেপাশের এলাকা পরোক্ষভাবে এসেছে। বইয়ের এক জায়গায় বলা আছে, “From the avenues of park street to the musty book alleys of College Street…” 

. Amitav Ghosh: Though not a foreigner by birth, internationally recognized writer

অমিতাভ গোষ-এর অনেক বইতেই কলকাতা আছে, যেমন The Shadow Lines। যদিও এটি মূলত ইংরেজিতে লেখা, এবং আন্তর্জাতিক পাঠকের জন্য, সেখানে কলেজ স্ট্রিট এবং বইপাড়ার উল্লেখ আছে, কলকাতার বৌদ্ধিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। “…the musty maze of College Street, where bookstalls whisper old revolutions.”

৩. The New York Times / BBC Travel / The Guardian

এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কলকাতা নিয়ে ভ্রমণ এবং সংস্কৃতিভিত্তিক অনেক প্রতিবেদন করেছে, যেগুলিতে College Street একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবে এসেছে।

BBC Travel:

“In Kolkata, College Street remains the intellectual heart of the city. Home to hundreds of bookshops and coffee houses, it’s a place where time slows down under the weight of knowledge.”

The New York Times (Travel Section):

“The city’s most evocative spot may be College Street, where miles of books and tea-soaked debate keep Kolkata’s academic legacy alive.”

The Guardian (2015 feature):

“College Street is where you can lose hours leafing through secondhand Marxist theory or forgotten Russian novels, with the occasional student protest echoing in the background.”

৪. William Dalrymple

Though mostly focused on Delhi, Dalrymple অনেক সময় কলকাতার বৌদ্ধিক চরিত্র এবং ঐতিহ্য নিয়ে লিখেছেন। তিনি তার বক্তৃতা এবং সাক্ষাৎকারে College Street কে “South Asia’s answer to the Left Bank of Paris” নামে অভিহিত করেছেন।

দেশে হোক কিংবা বিদেশে কলেজস্ট্রিটে বই সর্বত্র বিরাজ করে চলেছে অনন্তকাল ধরে।

তথ্যসূত্র: 

Previous article চৈত্র মেলা: বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য আর উৎসবের এক অনন্য রূপ
Next article বাংলার শ্যামা সংগীত ও পান্নালাল: ভক্তি, বেদনা আর বাংলার আত্মা
সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here